সম্মানিত লেখকবৃন্দ

MUHAMMAD HAMIDUR RAHMAN

হযরত প্রফেসর মুহাম্মাদ হামীদুর রহমান সাহেব দামাত বারাকাতুহুম (খলীফা, হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল−াহ হাফেজ্জী হুযুর রহমাতুল−াহি আলাইহি ও মুহিউস সুন্নাহ হযরত মাওলানা শাহ আবরারুল হক রহমাতুল−াহি আলাইহি) সে রকম একজন আল−াহওয়ালা যার বিনয় ও ধৈর্য, দুনিয়া বিমুখতা এবং সর্বোপরি সত্যের পথে নিরলস সাধনা বর্তমান সমাজে এক ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত। তার আশৈশব বেড়ে ওঠা ইংরেজি শিক্ষিত দ্বীনদারদের জন্য এক বিশেষ অনুপ্রেরণা। পরবর্তীতে উলামায়ে কেরামের সোহবত তাকে এমন উচ্চতায় আসীন করেছে যে, উলামাদের জন্যও তিনি পরিণত হয়েছেন এক বাস্তব আদর্শে। ইসলাহী কর্মকাণ্ডে তার সহজ-সরল উপস্থাপনা সবাইকে মুগ্ধ করে। তার সাথে থাকা, সফর করা এবং খেদমত করতে পারা - এ এক পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।   

প্রফেসর হযরত ৯ জানুয়ারী ১৯৩৮ সালে মুন্সিগঞ্জের নয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তার শ্রদ্ধেয় পিতা মরহুম ইয়াসিন সাহেব মসজিদের ইমাম, মুয়ায্যিন, মক্তবের  উস্তাদসহ অন্যান্য দ্বীনি কর্মে সংযুক্ত ব্যক্তিদের খেদমতে নিয়োজিত করেন। প্রফেসর হযরত ছোটবেলায় গ্রামের মকতবে কুরআন শিক্ষার জন্য একজন মহান উস্তাদ পেয়েছিলেন। তার নাম মকবুল হুসাইন রহমাতুল−াহি আলাইহি। তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্রিশ টাকা বেতনে গ্রামের মকতবে পড়াতেন। তিনি সকালে ফজরের পরে কুরআন শরীফ পড়াতে বসতেন, আর দুপুর বারটায় উঠতেন। তার তাকওয়া এবং পরহেজগারীর কথা হযরত প্রফেসর হযরত এখনো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ঢাকার ইসলামী হাই স্কুলে (যার কমিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন, মুফতি দ্বীন মুহাম্মাদ রহমাতুল−াহি আলাইহি) পড়ার সময়ে গনী মিয়ার হাট মসজিদে যখন যোহর নামায আদায় করতে যেতেন, তখন বাংলাদেশের বিখ্যাত তিন বুযূর্গ হযরত মাওলানা আব্দুল ওহাব রহ. (পীরজী হুযুর), হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. (সদর সাহেব হুযুর) এবং হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ রহ. (হাফেজ্জী হুযুর)-কে  দেখতে পেতেন।

 

প্রফেসর হযরত ইসলামিয়া হাই স্কুল থেকে ১৯৫৫ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় একুশতম স্থান অর্জন করে প্রথম বিভাগে এবং ঢাকা কলেজ  থেকে ১৯৫৭ সালে ইন্টারমিডিয়েটে তেরতম স্থান দখল করে প্রথম বিভাগে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পাশ করেন। পরবর্তীতে বুয়েট থেকে ১৯৬১ সালে সপ্তম স্থান অর্জন করে প্রথম বিভাগে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে দুই বছর এবং ইংলিশ ইলেট্রিক কো¤পানিতে প্রায় ছয় বছর চাকুরী করার পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এ ১৯৬৯ সালে এ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে বুয়েট থেকে এসিস্টেন্ট প্রফেসর হিসেবেই অবসর নেন। তারপর ওআইসির একটি প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি)-তে আরও সাত বছর এসিস্টেন্ট প্রফেসর হিসেবে ছিলেন। এখনো আইইউটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

তাবলীগ জামাআতেও তিনি অনেক সময় লাগিয়েছেন। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানে তিন চিল্লায় সময় লাগান। উক্ত সফরে তিনি হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহমাতুল−াহি আলাইহির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য লাভ করেন। তাবলীগে সময় লাগানোর সাথে সাথে ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল−াহি আলাইহি ও হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ.  লিখিত কিতাবাদি পাঠ করার ফলে তার মধ্যে দ্বীনের প্রতি আকর্ষণ আরো বৃদ্ধি পায়। তখন তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের বিখ্যাত আলেম হযরত মাওলানা আলতাফ হোসেন সাহেব রহ.-র খেদমতে হাজির হয়ে কোন হাক্কানী পীরের নিকট মুরীদ হওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তার পরিবারের মুরুব্বীগণ তখন ফুরফুরার পীর সাহেবের নিকট বাইআত ছিলেন। তার এ কথা শুনে হযরত মাওলানা আলতাফ হোসেন সাহেব তাকে হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ. নিকট নিয়ে যান এবং তখন তিনি হযরত হাফেজ্জী  হুযুর রহমাতুল−াহি আলাইহির নিকট বাইআত হন। হযরত হাফেজ্জী  হুযুর রহমাতুল−াহি আলাইহির নিকট মুরীদ হওয়ার পর হযরতের বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা মুমিনুল্লাহ সাহেব দামাত বারাকাতুহুম বার বার হযরতের খেদমতে তাকে বেশি বেশি অগ্রসর করে  দেন। ফলে হযরতের খাদেম হিসেবে হজের পবিত্র সফর ছাড়াও বিভিন্ন দেশে সফর করার সৌভাগ্য হয় এবং হযরতের সাথে একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

 

দ্বীনের পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহের আরেক অলী হযরত মাওলানা আব্দুল্লাহ সাহেব রহমাতুল−াহি আলাইহির ও বিরাট অবদান রয়েছে। কারণ তার সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা, তার নিজের আরবী ব্যাকরণ শিক্ষা এবং কুরআনে এত ব্যাপক পরিচিতির সূচনা তার মাধ্যমেই হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ. ইন্তেকালের পর হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল−াহি আলাইহির সর্বশেষ খলীফা হযরত মাওলানা শাহ আবরারুল হক সাহেব রহমাতুল−াহি আলাইহির সাথে সম্পর্কিত হন। ইসলামী জ্ঞানে এত পারদর্শী এবং প্রজ্ঞাবান হয়েও নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে আলেম নই। উলামায়ে কেরামের জুতা বহন করতে পারাটাও আমি নিজের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার মনে করি। আলেমদের কাছ থেকে কুরআন-হাদীসের আলোচনা শুনে সেগুলোই নকল করে থাকি। এক্ষেত্রে আমার কোন ভুল-ভ্রান্তি কারো দৃষ্টিগোচর হলে আমাকে বললে আমি সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সংশোধন করে নিব এবং তার প্রতি চির-কৃতজ্ঞ থাকব।’ এজন্য তার ইখলাসপূর্ণ সংক্ষিপ্ত বয়ানে যে অনুভূতি শ্রোতাদের অন্তঃকরণে ব্যাপৃত হয়, দীর্ঘ সময়ের অনেক আকর্ষণীয় জ্বালাময়ী বক্তৃতায়ও তা হয় না।   

Published July 05, 2015

Published July 05, 2015

সত্যের আধুনিক প্রকাশ

মাকবাতুল ফুরকান